ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর শক্তি কমলেও তার অবশিষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে বৃষ্টির দাপট অব্যাহত বাংলায়। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শনিবার দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কালিম্পংয়ে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা। রবিবার দার্জিলিং ও জলপাইগুড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতাও রয়েছে বলে দেওয়া পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। এর মধ্যেই দক্ষিণ আন্দামান সাগরে তৈরি হয়েছে নতুন নিম্নচাপ, যা আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হতে পারে।
শনিবার, ৩১ অক্টোবর বিকেলের আবহাওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে রাজ্যের একাধিক জেলায়। অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ স্থলভাগে প্রবেশের পর শক্তি হারিয়ে নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তার প্রভাবে তৈরি হওয়া বৃষ্টির পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি কাটেনি। দক্ষিণ ছত্তিশগড় ও লাগোয়া দক্ষিণ ওড়িশা থেকে নিম্নচাপটি উত্তর দিকে এগোচ্ছে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ আন্দামান সাগরে তৈরি হয়েছে নতুন একটি নিম্নচাপ। ফলে আগামী কয়েক দিন দেশের পূর্ব উপকূলের আবহাওয়ার উপর নজর রাখছে আবহাওয়া দফতর।
শক্তি হারাচ্ছে অর্ণব, উত্তর ছত্তিশগড়ের দিকে এগোচ্ছে নিম্নচাপ
আবহাওয়া দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর অবশিষ্ট নিম্নচাপটি গত ছয় ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্রায় ১৮ কিলোমিটার গতিতে উত্তর দিকে এগিয়েছে। বর্তমানে সেটি দক্ষিণ ছত্তিশগড় ও সংলগ্ন দক্ষিণ ওড়িশা অঞ্চলে অবস্থান করছে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে এই নিম্নচাপ আরও শক্তি হারিয়ে উত্তর ছত্তিশগড় ও উত্তর-পশ্চিম ওড়িশা সংলগ্ন এলাকায় সুস্পষ্ট নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি কমে গেলেও এর প্রভাবে বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বিভিন্ন এলাকায়।

দক্ষিণ আন্দামান সাগরে নতুন নিম্নচাপ, বাড়ছে নজরদারি
একটি নিম্নচাপ দুর্বল হওয়ার মধ্যেই বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয়েছে নতুন আবহাওয়া ব্যবস্থা। দক্ষিণ আন্দামান সাগর ও সংলগ্ন এলাকায় নতুন নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেটি সুস্পষ্ট নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। তার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এরপর নিম্নচাপটি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে যেতে পারে বলে আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস। তবে এই মুহূর্তে সেটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তাই নতুন করে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা ছড়ানোর আগে পরবর্তী সরকারি বুলেটিনের দিকে নজর রাখা জরুরি।

গত ২৪ ঘণ্টায় কোথায় কত বৃষ্টি?
গত ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হয়েছে। উপকূলবর্তী কয়েকটি জায়গায় ভারী বৃষ্টিও রেকর্ড করা হয়েছে। দেওয়া বৃষ্টির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাগরদ্বীপ, ইটামোগরা, দিঘা এবং পাঁশকুড়ায় সর্বোচ্চ ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
এ ছাড়াও গোপীবল্লভপুরে ৭০ মিলিমিটার, তমলুকে ৭০ মিলিমিটার, পুরিহাঁসায় ৬০ মিলিমিটার, ফুলবেড়িয়ায় ৫০ মিলিমিটার, মেদিনীপুরে ৫০ মিলিমিটার, ঝাড়গ্রামে ৫০ মিলিমিটার এবং হাওড়ার আমতায় ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
এই বৃষ্টির জেরে নিচু এলাকায় জল জমার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিজমিতেও অতিরিক্ত বৃষ্টির প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গের কোন কোন জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা?
শনিবার দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পরিমাণ ৭০ থেকে ১১০ মিলিমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে দেওয়া পূর্বাভাসে উল্লেখ রয়েছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুরে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রবিবার পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় অনেক জায়গায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য কয়েকটি জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে। তবে বৃষ্টির পরিমাণ ও সতর্কতার মাত্রা নিয়ে সর্বশেষ জেলা-ভিত্তিক সরকারি বুলেটিন দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
উত্তরবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা
উত্তরবঙ্গেও শনিবার আবহাওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। দেওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, সব জেলাতেই অনেক জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কালিম্পংয়ে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে।
রবিবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। দার্জিলিং ও জলপাইগুড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে। কালিম্পং ও আলিপুরদুয়ারেও ভারী বৃষ্টি হতে পারে। শনিবারের পর রবিবার এবং পরবর্তী দিনগুলিতেও উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
বজ্রপাত, জল জমা ও ধসের আশঙ্কা
একটানা বৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়ার কারণে একাধিক ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের নিচু এলাকায় জল জমতে পারে। বৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। অন্যদিকে দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টির জেরে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।
বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় থাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিরাপদ পাকা আশ্রয়ে থাকতে হবে। গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি বা জলাশয়ের কাছাকাছি দাঁড়ানো বিপজ্জনক হতে পারে।

মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ
সমুদ্রের পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে মৎস্যজীবীদের জন্যও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা ইতিমধ্যে সমুদ্রে রয়েছেন, তাঁদের আবহাওয়া দফতর ও প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলতে হবে।
সব মিলিয়ে, ঘূর্ণিঝড় অর্ণব দুর্বল হলেও তার প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি। তার মধ্যেই দক্ষিণ আন্দামান সাগরে নতুন নিম্নচাপ তৈরি হওয়ায় আবহাওয়ার পরিস্থিতির উপর নজর রাখা জরুরি। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি জেলা এবং দক্ষিণবঙ্গের উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।