রাজ্যের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে বিপুল আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্য। একাধিক নার্সিংহোম মালিক এবং উপভোক্তা বেনামে চিঠি পাঠিয়েছেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের কাছে। তাঁদের দাবি, প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এবং তার প্রমাণ তাঁদের কাছে রয়েছে। চিঠিতে পাওয়া তথ্য যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যসাথী নিয়ে বেনামি চিঠি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে
পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে এবার নতুন করে সরগরম রাজ্য রাজনীতি ও প্রশাসনিক মহল। রাজ্যের একাধিক নার্সিংহোম মালিক এবং স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের উপভোক্তারা বেনামে চিঠি পাঠিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের কাছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রকল্পের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। চিঠিতে দুর্নীতির একাধিক তথ্য এবং প্রমাণ থাকার দাবিও করা হয়েছে।
রবিবার এই বিষয়ে মুখ খুলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, গত কয়েক দিন ধরেই তাঁর কাছে একাধিক বেনামি চিঠি আসছে। এমনকি রবিবার তাঁর বাড়ির ঠিকানায় দু’টি চিঠি এসেছে বলেও জানান তিনি। চিঠি পাঠানো ব্যক্তিরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাইছেন না। তবে তাঁদের অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
চিঠিতে কী অভিযোগ করেছেন নার্সিংহোম মালিকেরা?
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, চিঠি পাঠানো একাধিক নার্সিংহোম মালিকের দাবি, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি হয়েছে। তাঁদের কাছে এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে চিঠিতে ঠিক কী কী তথ্য দেওয়া হয়েছে, কোন কোন হাসপাতাল বা নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, বেনামি চিঠির প্রেরকদের পরিচয় জানা না গেলেও তাঁদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হবে। অভিযোগের সঙ্গে কোনও নথি বা প্রমাণ থাকলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।
তবে শুধু বেনামি চিঠি পাওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই, নথিপত্র পরীক্ষা এবং তদন্তের ভিত্তিতেই প্রকৃত অনিয়মের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব।
ভুয়ো কার্ড, রোগী ও হাসপাতালের বিলের অভিযোগ
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের প্রাথমিক তদন্তের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, প্রকল্পের আওতায় ভুয়ো উপভোক্তা, ভুয়ো রোগী এবং ভুয়ো চিকিৎসার নথির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও ভুয়ো রোগীর নামে চিকিৎসার বিল তৈরি করা হয়েছে, কোথাও চিকিৎসকের জাল সই ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ভুয়ো হাসপাতাল বা নার্সিংহোমের নামে বিল তৈরির অভিযোগও উঠেছে। এই ধরনের অনিয়মের সঙ্গে একাধিক সংস্থা জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মন্ত্রী।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, প্রাথমিক তদন্তে প্রায় ৩০ লক্ষ উপভোক্তার নাম ঘিরে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে এই সংখ্যার মধ্যে কতজন প্রকৃতপক্ষে ভুয়ো উপভোক্তা, আর কতজনের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
শো-কজ করা হয়েছে হাসপাতাল ও বিমা সংস্থাকে
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে যেসব অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে, তার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে শো-কজ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হাসপাতাল, নার্সিংহোম এবং থার্ড পার্টি ইনস্যুরেন্স সংস্থার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মন্ত্রী দাবি করেছেন, শো-কজের জবাবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির দেওয়া ব্যাখ্যায় তাঁরা সন্তুষ্ট নন। ফলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ করা হতে পারে।
তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে শো-কজ করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট নথি ও জবাব যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
হাজার হাজার কোটি টাকা, নাকি কয়েক কোটি? অঙ্ক নিয়ে বিভ্রান্তি
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে দুর্নীতির আর্থিক পরিমাণ নিয়েও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়মের আশঙ্কার কথা বলা হলেও PTI-ভিত্তিক একাধিক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ২৫–৩০ কোটি টাকার অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অঙ্ক নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসা অভিযোগ এবং চূড়ান্ত অডিটের ফলের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির বিষয়টি নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের তথ্যভাণ্ডার খতিয়ে দেখতে ফরেনসিক অডিটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে। উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই, কার্ডের বৈধতা পরীক্ষা এবং চিকিৎসার বিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি মিলিয়ে দেখার কাজ চলছে।
এই তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্পে প্রকৃত অনিয়মের পরিমাণ, কারা জড়িত এবং সরকারি অর্থের কোনও অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজ্যের সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার ক্ষেত্রে আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া। সেই প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়, প্রকৃত উপভোক্তারা কতটা সুবিধা পাচ্ছেন এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ।
এখন নজর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে আসা বেনামি চিঠিগুলির তথ্য যাচাই এবং চলমান তদন্তের দিকে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা দেখার অপেক্ষায় রাজ্যের স্বাস্থ্য মহল।