ভারতের প্রযুক্তি জগতে তরুণ প্রতিভার অভাব নেই। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ভাবন এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো কি যথেষ্ট? বেঙ্গালুরুর ডিপ-টেক স্টার্টআপ BioCompute-র প্রতিষ্ঠাতা অনাগা রাজেশের সান ফ্রান্সিসকোয় পাড়ি সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে।
ভারতের প্রযুক্তি জগৎ। একের পর এক তরুণ প্রতিভা। চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। অথচ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই কি তাঁদের দেশ ছাড়তে হচ্ছে? আমাদের দেশ কি সত্যিই মেধাকে ধরে রাখতে পারছে না? নাকি চারপাশে জমে উঠেছে ইঁদুর দৌড়, তাৎক্ষণিক লাভের মোহ আর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রতি এক গভীর উদাসীনতা?
এক তরুণ উদ্যোক্তার স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং বিদেশে পাড়ি দেওয়ার গল্প। যে গল্প শুধু একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্তের নয়, বরং ভারতের গবেষণা, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পরিবেশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে।
২৪ বছরেই ডিএনএ-তে তথ্য সংরক্ষণের স্বপ্ন
অনাগা রাজেশ। বয়স মাত্র ২৪ বছর। বেঙ্গালুরুতে BioCompute নামে একটি ডিপ-টেক স্টার্টআপ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে গোটা বিশ্বের তথ্য সংরক্ষণের ধারণাকে বদলে দিতে পারে। প্রযুক্তির নাম—ডিএনএ ডেটা স্টোরেজ।

আজকের পৃথিবীতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল তথ্য তৈরি হচ্ছে। ছবি, ভিডিও, সিনেমা, গবেষণার নথি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্য—সবকিছু সংরক্ষণ করতে প্রয়োজন বিশাল ডেটা সেন্টার। সেই পরিকাঠামো চালাতে লাগে বিপুল জায়গা, বিদ্যুৎ এবং অর্থ।
অনাগার স্বপ্ন ছিল, এই বিপুল তথ্যের একাংশ যদি ডিএনএ অণুর মধ্যে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতের ডেটা স্টোরেজ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে।
ডিএনএ-র ভিতরে কীভাবে থাকবে ডিজিটাল তথ্য?
ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড জীবের জিনগত তথ্য বহন করে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই এই অণুর মধ্যে ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছেন।
ডিএনএ-র চারটি রাসায়নিক ভিত্তি—A, T, C এবং G—কে নির্দিষ্ট ডিজিটাল সংকেতের সঙ্গে মিলিয়ে তথ্য এনকোড করা সম্ভব। পরে সেই তথ্য আবার পড়ে উদ্ধার করা যায়।
এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা অত্যন্ত বড়। প্রচলিত স্টোরেজের তুলনায় অনেক কম জায়গায় বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদে তা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রযুক্তিটি এখনও গবেষণা ও উন্নয়নের পর্যায়ে। বাস্তব জীবনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করার আগে খরচ, তথ্য পুনরুদ্ধারের গতি, নির্ভরযোগ্যতা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
BioCompute-র লক্ষ্য ছিল সেই চ্যালেঞ্জগুলির সমাধান খুঁজে বের করা।

পাঁচ কোটির বেশি বিনিয়োগ, গবেষণাগার ও প্রোটোটাইপ
২০২৪ সালে BioCompute প্রতিষ্ঠা করেন অনাগা। পরবর্তী দু’বছরে সংস্থাটি একটি বিশেষজ্ঞ দল গড়ে তোলে, গবেষণাগার স্থাপন করে এবং হাজার হাজার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রযুক্তির প্রাথমিক নমুনা তৈরি করে।সংস্থাটি WTF Fund, Grad Capital এবং 1517 Fund-সহ বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকারও বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছিল।
অনাগার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের গবেষণার পরিকাঠামো এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে পরীক্ষাগার পরিচালনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে BioCompute প্রাথমিক প্রযুক্তিগত সাফল্য অর্জন করে। কিন্তু গবেষণাগারে প্রোটোটাইপ তৈরি করা আর সেই প্রযুক্তিকে বাজারে ব্যবহারযোগ্য পণ্যে পরিণত করা এক বিষয় নয়।
পরবর্তী ধাপে প্রয়োজন আরও বড় বিনিয়োগ, উন্নত পরিকাঠামো, বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
কেন সান ফ্রান্সিসকোয় পাড়ি?
২০২৬ সালের জুনে অনাগা ঘোষণা করেন, BioCompute-র পরবর্তী পর্যায়ের কাজ সান ফ্রান্সিসকো থেকে পরিচালিত হবে। তাঁর মতে, নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনা বোঝা এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে সেখানকার বিনিয়োগকারীরা বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন।একটি ডিপ-টেক সংস্থার ক্ষেত্রে দ্রুত মুনাফা অর্জন সবসময় সম্ভব নয়। বছরের পর বছর গবেষণা, পরীক্ষা, ব্যর্থতা এবং প্রযুক্তির উন্নয়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেই কারণে এমন সংস্থার জন্য প্রয়োজন ‘পেশেন্ট ক্যাপিটাল’—অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে প্রস্তুত বিনিয়োগ। অনাগার অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা মূল প্রশ্নটি এখানেই। ভারতে কি এমন বিনিয়োগের পরিবেশ যথেষ্ট তৈরি হয়েছে?
মেধা আছে, কিন্তু গবেষণার পরিবেশ কতটা?
অনাগা রাজেশের সিদ্ধান্তকে শুধু দেশ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি ভারতের ডিপ-টেক শিল্পের সামনে থাকা সমস্যাগুলির একটি উদাহরণ।
ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার এবং ডিজিটাল পরিষেবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। কিন্তু জীবপ্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত কম্পিউটিং এবং নতুন বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে গবেষণা থেকে বাণিজ্যিক সাফল্যে পৌঁছতে দীর্ঘ সময় লাগে।
সেখানে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের সহযোগিতা, গবেষণার স্বাধীনতা এবং সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রতিভা থাকা আর সেই প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ পাওয়া—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। একজন তরুণ গবেষক যদি নিজের দেশে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পান, তাহলে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর কাছে বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
দেশের জন্য বড় প্রশ্ন
গুগল কিংবা মেটার মতো প্রযুক্তি সংস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। প্রয়োজন হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, গবেষণার স্বাধীনতা, দক্ষ কর্মী এবং ঝুঁকি নেওয়ার সাহস।
অনাগা রাজেশের গল্প সেই সাহসেরই এক পরীক্ষা। তিনি ভারতে গবেষণার ভিত্তি তৈরি করেছেন, বিনিয়োগও পেয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ের জন্য বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তাহলে প্রশ্ন একটাই—ভারত কি শুধু প্রতিভা তৈরি করবে, নাকি সেই প্রতিভাকে বিশ্বমানের প্রযুক্তি গড়ে তোলার সুযোগও দেবে?
মেধা বিদেশে গেলে শুধু একজন মানুষ বা একটি সংস্থা দেশ ছাড়ে না। সঙ্গে চলে যেতে পারে গবেষণার অভিজ্ঞতা, ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান এবং নতুন প্রযুক্তি তৈরির সম্ভাবনাও। তাই অনাগার গল্পকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার চোখে নয়, ভারতের প্রযুক্তিগত ভবিষ্যতের প্রশ্ন হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।