রাজ্যের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকা যাচাই করতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক কার্ডধারীর খোঁজ মিলছে না বলে দাবি নবান্নের। সরকারি সূত্রের দাবি, ২০ থেকে ২৫ লক্ষ নাম নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। অন্যদিকে, কয়েকটি রিপোর্টে সংখ্যাটি ৩০ লক্ষেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অনিয়ম চিহ্নিত করে ভুয়ো উপভোক্তার নাম বাদ দেওয়া গেলে সরকারি কোষাগারে বিপুল অর্থ সাশ্রয় হতে পারে বলে মনে করছে প্রশাসনের একাংশ।
স্বাস্থ্যসাথীর তালিকায় এত নাম, অথচ খোঁজ নেই কেন?
রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প স্বাস্থ্যসাথী নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারি সূত্রের দাবি, প্রকল্পের উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ কার্ডধারীর বর্তমান ঠিকানায় তাঁদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। কারও দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির খোঁজ মিলছে না, আবার কোথাও নথিতে থাকা তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ।
‘এই সময়’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লক্ষ উপভোক্তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা’ এবং ‘টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিবেদনে সংখ্যাটি ৩০ লক্ষেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ঠিক কতগুলি নাম সন্দেহের তালিকায় রয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সংখ্যার কিছুটা ফারাক রয়েছে।

আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্তির প্রক্রিয়াতেই সামনে এল অসঙ্গতি
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, স্বাস্থ্যসাথীর উপভোক্তাদের তথ্য যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে তাঁদের কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প অথবা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার আওতায় যুক্ত করার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে। সেই কাজের অংশ হিসেবেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে কার্ডধারীদের পরিচয়, ঠিকানা এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই যাচাইয়ের সময়ই পুরনো তালিকার সঙ্গে বাস্তবের একাধিক অসঙ্গতি সামনে এসেছে বলে দাবি। যাঁদের নামে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড রয়েছে, তাঁদের অনেকেরই বর্তমান ঠিকানায় খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনের একাংশের বক্তব্য, শুধু স্বাস্থ্যসাথী নয়, আগের সরকারের আমলে চালু হওয়া অন্যান্য সামাজিক প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকাতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে।
তবে কারও ঠিকানায় তাঁকে না পাওয়া গেলেই যে তিনি ভুয়ো উপভোক্তা, তা ধরে নেওয়া যায় না। ঠিকানা পরিবর্তন, কর্মসূত্রে অন্যত্র চলে যাওয়া, নথিতে ভুল কিংবা মৃত্যুর মতো কারণও থাকতে পারে। তাই প্রকৃত জালিয়াতি চিহ্নিত করতে বিস্তারিত যাচাই প্রয়োজন।
২৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের হিসাব কোথা থেকে?
এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সম্ভাব্য আর্থিক সাশ্রয়ের অঙ্ক। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে অযোগ্য বা অস্তিত্বহীন উপভোক্তার নাম বাদ দেওয়া গেলে রাজ্যের কোষাগারে প্রায় ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে।
‘টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যসাথী, খাদ্যসাথী এবং কৃষকবন্ধুর মতো একাধিক প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকায় অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ৩০ লক্ষেরও বেশি উপভোক্তার খোঁজ না পাওয়ার পাশাপাশি খাদ্যসাথী প্রকল্পেও বহু উপভোক্তার সন্ধান না মেলার দাবি রয়েছে। অর্থাৎ ২৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য সাশ্রয়ের হিসাবটি শুধু স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের জন্য নয়, একাধিক সরকারি প্রকল্পের সামগ্রিক হিসাবের সঙ্গে যুক্ত।
২০১৭ সাল থেকে স্বাস্থ্যসাথীতে বিপুল সরকারি ব্যয়
২০১৭ সালে চালু হওয়া স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় রাজ্যের বহু পরিবারকে স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে একটি পরিবারের জন্য বছরে সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা রয়েছে। সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ কোটি ৪৫ লক্ষ পরিবার নথিভুক্ত ছিল এবং চালু হওয়ার পর থেকে রাজ্যের কোষাগার থেকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
গত কয়েক বছরে প্রকল্পটির মাধ্যমে বহু মানুষ চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে উপভোক্তা তালিকায় অসঙ্গতির অভিযোগ উঠলেও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের স্বার্থ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
ভুয়ো কার্ড বাতিলের আগে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে এত বিপুল সংখ্যক উপভোক্তার তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের মিল পাওয়া যাচ্ছে না? তালিকা তৈরির সময় কি যথাযথ যাচাই হয়নি, নাকি পরবর্তী সময়ে তথ্য হালনাগাদ না করার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে? কোথাও ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়ো নাম ঢোকানো হয়ে থাকলে তার পিছনে কারা জড়িত, সেটিও তদন্তের বিষয়।
তবে এখনও পর্যন্ত কতগুলি কার্ড সত্যিই ভুয়ো, কতগুলি ক্ষেত্রে শুধু ঠিকানা বা নথির সমস্যা রয়েছে এবং সন্দেহজনক নামের ভিত্তিতে বাস্তবে কত টাকা খরচ হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে আসেনি। তাই ২৫ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি হয়েছে বা ওই পরিমাণ অর্থ নিশ্চিতভাবে উদ্ধার হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।
প্রকৃত উপভোক্তাদের অধিকার রক্ষা করাই বড় পরীক্ষা
স্বাস্থ্যসাথীর তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে দুটি লক্ষ্য—একদিকে সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধ করা, অন্যদিকে প্রকৃত দরিদ্র ও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার অধিকার সুরক্ষিত রাখা। ভুল তথ্যের কারণে কোনও বৈধ উপভোক্তার কার্ড বাতিল হয়ে গেলে তিনি বিপাকে পড়তে পারেন। তাই কার্ড বাতিলের আগে নোটিস, পুনরায় নথি যাচাই এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখা জরুরি।

সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকা ঘিরে এই বিতর্ক রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন নজর, যাচাইয়ের কাজ শেষ হলে সরকার কতগুলি নামকে সত্যিই ভুয়ো বলে চিহ্নিত করে এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের পক্ষে কী তথ্য সামনে আনে।