দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো ও বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রিকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। একদিকে পুলিশকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যদিকে তাঁকে ‘সোডিয়াম-পটাশিয়ামের সমস্যা’ হয়েছে বলে কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই পরিস্থিতিতে দলের প্রবীণ নেতা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য, ‘রাজনীতিতে থাকাটাই এখন বেদনাদায়ক।’
কী অভিযোগে গ্রেফতার ইন্দ্রনীল সেন?
পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি এবং পর্যটন প্রতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে বুধবার, ২৮ অক্টোবর গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির দফতরে জিজ্ঞাসাবাদের পর সেখান থেকে বেরোনোর সময় তাঁকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
এই মামলার কেন্দ্রে রয়েছে MassArt Society নামে একটি সংস্থা। অভিযোগ, দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রির মাধ্যমে ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। সংস্থাটির সঙ্গে ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর স্ত্রী মধুচ্ছন্দা সেনের যোগ থাকার অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তকারীদের দাবি, ইউনেস্কোর নাম ও স্বীকৃতির সঙ্গে সংস্থাটির সম্পর্ক রয়েছে, এমন ধারণা তৈরি করে বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রি করা হয়েছিল। অথচ ইউনেস্কোর সঙ্গে এ ধরনের কোনও বাণিজ্যিক চুক্তি ছিল না বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এই মামলায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি।

ইডির জিজ্ঞাসাবাদের পরেই গ্রেফতার
ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই তদন্ত শুরু হয়েছিল। এর আগে তাঁর একাধিক ঠিকানায় তল্লাশি চালিয়েছিল ইডি। তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখা হয়।
২৮ অক্টোবর সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির দফতরে হাজিরা দেন প্রাক্তন মন্ত্রী। সেখানে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর বেরিয়ে আসতেই কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের আধিকারিকরা তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেন। পরদিন তাঁকে আদালতে পেশ করা হলে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
তবে গ্রেফতার হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারপ্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।
পুলিশকে হুঁশিয়ারি অভিষেকের
ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অন্দরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাকে সামনে রেখেই পুলিশ প্রশাসনের একাংশের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে খুশি করতে গিয়ে কিছু পুলিশ আধিকারিক তৃণমূল কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসাচ্ছেন।
অভিষেকের বক্তব্য, যেসব পুলিশ আধিকারিক রাজনৈতিক নির্দেশে কাজ করছেন বলে তাঁর অভিযোগ, তাঁদের নাম চিহ্নিত করে রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তন হলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারি এবং নিজের আপ্তসহায়কের বিরুদ্ধে চলা মামলার প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

‘সোডিয়াম-পটাশিয়ামের গন্ডগোল’, পাল্টা কটাক্ষ শুভেন্দুর
অভিষেকের মন্তব্যের পর শুক্রবার পাল্টা আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সল্টলেকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অভিষেককে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, তাঁর হয়তো ‘সোডিয়াম-পটাশিয়ামের গন্ডগোল’ হয়েছে। এমনকি চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্ক যেতে চাইলে প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র দেওয়ার কথাও ব্যঙ্গের সুরে বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দুর আরও দাবি, অভিষেকের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী গ্রেফতার হওয়ার পর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। যদিও এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত। মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের পর তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে বাকযুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর যে নতুন মাত্রা পেয়েছে, তা স্পষ্ট।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যে তৃণমূলের অন্দরেও প্রশ্ন
ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারির ঘটনায় শুধু বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে রাজনৈতিক তরজাই নয়, দলের অন্দরেও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, রাজনীতিতে থাকাটাই এখন অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
তাঁর বক্তব্য, রাজনীতিতে কিছু মানুষ দলকে ভালোবাসার পরিবর্তে ক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর মতে, অতিরিক্ত ক্ষমতাই দুর্নীতির অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে। ইন্দ্রনীল সেনের পাশাপাশি দলের আরও কয়েকজন নেতার নাম উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন একের পর এক এমন অভিযোগ সামনে আসছে।
কল্যাণের এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, তিনি শুধু বিরোধী দলের সমালোচনা করেননি, নিজের দলের মধ্যেও ক্ষমতা ও দুর্নীতির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তদন্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপানউতোর
ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। MassArt Society-র মাধ্যমে কত টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেই অর্থ কোথায় ব্যবহার হয়েছে এবং সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।
অন্যদিকে, এই গ্রেফতারিকে ঘিরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর পাল্টাপাল্টি মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়েছে। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য আবার তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সব মিলিয়ে ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারি এখন শুধুমাত্র একটি আর্থিক অনিয়মের তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক সংঘাত, পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা এবং শাসক দলের অন্দরের অসন্তোষ। তদন্তে আগামী দিনে কী তথ্য সামনে আসে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।