দুই দিনের গুজরাট সফরের প্রথম দিনেই বড়সড় কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। শুক্রবার বানাসকান্থা থেকে ১৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকারও বেশি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করলেন তিনি। একই মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি প্রকল্পের ২৪তম কিস্তির অর্থও কৃষকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে। এই কিস্তিতে উপকৃত হয়েছেন দেশের ৯.৩৪ কোটিরও বেশি কৃষক। পাশাপাশি বিরোধীদের আক্রমণ করে মোদী জানিয়েছেন, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশের মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকবেন তিনি।
দুই দিনের গুজরাট সফরে প্রধানমন্ত্রী
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর থেকে দু’দিনের গুজরাট সফর শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সফরের প্রথম দিনেই বানাসকান্থা জেলায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন, নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং কৃষকদের আর্থিক সহায়তা প্রদান—সব মিলিয়ে এই সফরকে ঘিরে ছিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা।
প্রধানমন্ত্রীর দফতরের আগাম ঘোষণা অনুযায়ী, বানাসকান্থায় ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের প্রকল্পের উদ্বোধন, শিলান্যাস এবং জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করার কর্মসূচি ছিল। পাশাপাশি PM-Kisan প্রকল্পের ২৪তম কিস্তিতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা কৃষকদের অ্যাকাউন্টে পাঠানোর পরিকল্পনাও জানানো হয়েছিল। শুক্রবার সেই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়।

৯.৩৪ কোটি কৃষকের অ্যাকাউন্টে কিষাণ নিধির টাকা
এই সফরের অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি বা PM-Kisan প্রকল্পের ২৪তম কিস্তি প্রকাশ। শুক্রবার বানাসকান্থা থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই অর্থ হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৯.৩৪ কোটিরও বেশি কৃষকের অ্যাকাউন্টে ১৮,৬৯০ কোটি টাকার বেশি পাঠানো হয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য কৃষক পরিবারগুলিকে বছরে মোট ৬,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। তিনটি সমান কিস্তিতে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায় সেই টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি যোগ্য কৃষক পরিবার বছরে ২,০০০ টাকা করে তিনবার আর্থিক সহায়তা পায়।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের দৈনন্দিন কৃষিকাজের খরচ এবং অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে কিছুটা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে কেন্দ্রের। তবে প্রত্যেক কৃষকের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছনোর বিষয়টি নির্ভর করে তাঁর যোগ্যতা, নথিপত্র এবং e-KYC সংক্রান্ত শর্ত পূরণের উপর।
বানাসকান্থায় ১৪ হাজার কোটিরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্প
কৃষকদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি গুজরাটের পরিকাঠামো, কৃষি এবং পশুপালন ক্ষেত্রের উন্নয়নের উপরও বিশেষ জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বানাসকান্থায় ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করার কর্মসূচি নেওয়া হয়।
এই প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে কৃষি পরিকাঠামো, দুগ্ধশিল্প, পশুপালন, সড়ক যোগাযোগ, শিশুদের জন্য উন্নত পরিষেবা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত উদ্যোগ। কৃষি পরিকাঠামো তহবিলের আওতায় তৈরি ৫২১টি প্রকল্পও জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছে। প্রায় ৪,৯৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি এই পরিকাঠামোর মধ্যে রয়েছে কোল্ড স্টোরেজ, গুদাম, সাইলো, গ্রিনহাউস এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র।
এ ছাড়াও ১২টি হর্টিকালচার ক্লাস্টার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে উচ্চমূল্যের উদ্যানপালন ফসলের উৎপাদন এবং কৃষকদের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পশুপালন ও দুগ্ধশিল্পে বিশেষ গুরুত্ব
বানাসকান্থার কর্মসূচিতে পশুপালন ও দুগ্ধশিল্পের উন্নয়নও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ভারত বভাইন ব্রিডিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার বা BBBRC পরিদর্শন করেন এবং এই কেন্দ্রকে দেশের উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। প্রায় ১২৭ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রের লক্ষ্য উন্নত পশুপ্রজনন, জিনগত মানোন্নয়ন এবং আধুনিক প্রজনন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
এছাড়াও ভ্রূণ প্রতিস্থাপন প্রযুক্তি ও ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা ET-IVF সংক্রান্ত গবেষণাগার পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। পশুপালনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষকদের আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করাই এই উদ্যোগগুলির অন্যতম উদ্দেশ্য।
পাশাপাশি বানাস ডেয়ারির দুটি বায়ো-CNG প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কর্মসূচিও রয়েছে। এই ধরনের প্রকল্পে গবাদি পশুর বর্জ্য ব্যবহার করে জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটানো সম্ভব।
বিরোধীদের আক্রমণ, কী বললেন মোদী?
উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও কৃষকদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যও উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে। বিরোধীদের আক্রমণ করে মোদী বলেন, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি দেশের মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকবেন।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে কৃষকদের স্বার্থ, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবের প্রসঙ্গও। প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সার ও রান্নার গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার সময় বিরোধীরা নানা গুজব ছড়িয়েছিল। তাঁর দাবি, কৃষকদের উপর সারের মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপতে দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকার।
তবে এই বক্তব্যগুলি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ভাষণের অংশ। বিরোধীদের তরফে এই অভিযোগের জবাব বা পাল্টা বক্তব্য থাকলে সেটিও প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

গুজরাট সফরের দ্বিতীয় দিনেও একাধিক কর্মসূচি
প্রধানমন্ত্রীর গুজরাট সফর শুধু বানাসকান্থাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ৩১ অক্টোবর তিনি একতা নগরে গিয়ে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় ঐক্য দিবসের কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। স্ট্যাচু অফ ইউনিটি-তে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি একতা নগরে ৪০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাসের কর্মসূচিও রয়েছে।
সব মিলিয়ে কৃষি, পশুপালন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের একাধিক উদ্যোগকে সামনে রেখে গুজরাট সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। PM-Kisan-এর ২৪তম কিস্তির অর্থ হস্তান্তর দেশের কোটি কোটি কৃষকের কাছে এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হয়ে উঠেছে।