পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার জেরে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে দামের চাপ বাড়ছে। তার প্রভাব পড়েছে পাকিস্তানের ডিজেলের দামে। পরিবহণ খরচ বাড়লে তার আঁচ খাদ্যপণ্য-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজারেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা।
কতটা বাড়ল ডিজেলের দাম?
পাকিস্তান সরকার ৩০ অক্টোবর শুক্রবার হাই-স্পিড ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ২.২৯ পাকিস্তানি রুপি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে ডিজেলের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে প্রতি লিটার ৪০২.৯৬ রুপি। আগে এই জ্বালানির দাম ছিল ৪০০.৬৭ রুপি। অন্যদিকে, পেট্রলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে—প্রতি লিটার ৩৭৭.৯১ রুপি। নতুন দাম ৩১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ডিজেলের দাম ফের ৪০০ রুপির গণ্ডি পেরিয়ে আরও উপরে উঠল। পাকিস্তানের পরিবহণ ব্যবস্থা, কৃষিকাজ এবং পণ্য সরবরাহের বড় অংশই ডিজেল নির্ভর। ফলে দাম সামান্য বাড়লেও তার প্রভাব অর্থনীতির একাধিক ক্ষেত্রে পড়তে পারে।

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব জ্বালানির বাজারে
পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা সংঘাত আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ পথগুলিতে বিঘ্নের আশঙ্কা এবং সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ওঠানামা হচ্ছে। আমদানিনির্ভর পাকিস্তানের মতো দেশের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
চলতি বছরের শুরুতে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানে জ্বালানির দামে বড়সড় ওঠানামা দেখা গিয়েছে। ডন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ এপ্রিল ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৫২০.৩৫ রুপিতে পৌঁছেছিল। পরে দাম কমলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ফের বাড়তে শুরু করেছে।
পরিবহণ খরচ বাড়লে দাম বাড়তে পারে নিত্যপণ্যেরও
ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে পণ্য পরিবহণে। পাকিস্তানে ট্রাক, বাস, ভারী যানবাহন ছাড়াও কৃষিক্ষেত্রে ট্রাক্টর, সেচের পাম্প এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালাতে ডিজেল ব্যবহার করা হয়। ফলে জ্বালানির খরচ বাড়লে কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারে পৌঁছে দেওয়ার খরচও বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে চাল, আটা, ডাল, সবজি, দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাজারে সব পণ্যের দাম কতটা বাড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পরিবহণ খরচ, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং সরকারের মূল্য নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপের উপরেও তা নির্ভর করবে।

পাকিস্তানে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আগে থেকেই
পাকিস্তানে মূল্যবৃদ্ধির চাপ যে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট, তা সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশের স্বল্পমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধির হার বা সেনসিটিভ প্রাইস ইনডেক্স (SPI) ছিল ১১.৩২ শতাংশ। ওই সপ্তাহে ৫১টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে ১৫টির দাম বেড়েছে, ১২টির দাম কমেছে এবং ২৪টির দাম অপরিবর্তিত ছিল।
একই পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, গত এক বছরে ডিজেলের দাম ৪৫.১৩ শতাংশ এবং পেট্রলের দাম ৪৩.৬১ শতাংশ বেড়েছে। আটা, মুরগির মাংস, দুধ-সহ একাধিক পণ্যের দামও বেড়েছে। ফলে নতুন করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের উপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
স্বস্তির বদলে বাড়ছে উদ্বেগ
জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাকিস্তান সরকার আগে মোটরসাইকেল, রিকশা এবং ৮০০ সিসি পর্যন্ত ছোট গাড়ির মালিকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক জ্বালানি সহায়তা প্রকল্প চালু করেছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা এবং দেশের আর্থিক পরিস্থিতির কারণে এই ধরনের সহায়তা কতটা দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানে ডিজেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি শুধু জ্বালানির খরচ বাড়ানোর বিষয় নয়। এর প্রভাব পরিবহণ, কৃষি এবং পণ্য সরবরাহের উপর পড়তে পারে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চড়া থাকলে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের উপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকছে।