পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের আবহে আমেরিকার সঙ্গে সমঝোতার নতুন পথ খুঁজছে তেহরান? সামনে এল এমনই এক প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব, যেখানে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডার অন্য দেশে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, প্রাথমিক সমঝোতার সাত দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী। তবে এখনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
কী রয়েছে ইরান-আমেরিকার প্রস্তাবিত সমঝোতায়?
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের মধ্যে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া ইংলিশ-এর হাতে আসা একটি প্রাথমিক খসড়া কাঠামোর কথা তুলে ধরে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অন্য কোনও সম্মত দেশে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বিকল্প হিসেবে ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধির মাত্রা কমানোর কথাও বলা হয়েছে।
এই প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া। প্রাথমিক সমঝোতা হলে সাত দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য এই জলপথ খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এটি এখনও আলোচনার পর্যায়ের প্রস্তাব, ইরান বা আমেরিকা—কোনও পক্ষই চূড়ান্ত চুক্তির কথা ঘোষণা করেনি।

চিনের ভূমিকা কী হতে পারে?
প্রস্তাবিত কাঠামোয় চিনের সম্ভাব্য ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। কোনও চুক্তি হলে তার বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে চিনকে গ্যারান্টর বা নিশ্চয়তাদাতা দেশ হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতা নয়, চুক্তির শর্তগুলি যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতেও তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে চিন এই দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়েছে, এমন কোনও নিশ্চিত ঘোষণা এখনও সামনে আসেনি।
ইস্তানবুল নয়, বৈঠক হতে পারে দোহায়
প্রাথমিক খসড়ায় আমেরিকা ও ইরানের সরাসরি আলোচনার সম্ভাব্য স্থান হিসেবেও পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। আগে ইস্তানবুলে আলোচনার পরিকল্পনার কথা সামনে এলেও নতুন প্রস্তাবে কাতারের রাজধানী দোহাকে বৈঠকের স্থান হিসেবে বিবেচনা করার কথা রয়েছে।
এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে কাতারও। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ-র খবর অনুযায়ী, শুক্রবার কাতারের একটি প্রতিনিধি দল তেহরানে পৌঁছয়। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও বিদেশমন্ত্রীর এক সিনিয়র উপদেষ্টা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এই প্রতিনিধি দল সংঘর্ষবিরতি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একটি চিঠিও কাতারের দূতদের মাধ্যমে ইরানের নিরাপত্তা আধিকারিক মোহসেন রেজাইয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে খবর।
নিষেধাজ্ঞা শিথিলের শর্তও রয়েছে
প্রস্তাবিত সমঝোতায় ইরানের উপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়টিও রয়েছে। অর্থাৎ, ইরান যদি পরমাণু কর্মসূচি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়, তার বিনিময়ে আমেরিকাকেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দিতে হতে পারে।
খসড়ায় স্বাধীন যাচাই ব্যবস্থার প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে চুক্তির প্রতিটি ধাপে দুই পক্ষ নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালন করছে কি না, তা যাচাই করা হবে। কোনও পক্ষের ছাড় দেওয়ার আগে অন্য পক্ষের সংশ্লিষ্ট প্রতিশ্রুতিও বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া চুক্তি কার্যকর করার পথে দেরি বা শর্ত লঙ্ঘনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তা মেটাতে মধ্যস্থতাকারী এবং গ্যারান্টর দেশগুলিকে নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার প্রস্তাবও রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সংঘাত নিয়ে কঠোর অবস্থানও বজায় রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি দাবি করেছেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহী হলেও আমেরিকার যুদ্ধ শেষ করার কোনও তাড়াহুড়ো নেই। তাঁর বক্তব্য, ওয়াশিংটনের হাতে সময় রয়েছে।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, ইরানের সেনা ও পুলিশকর্মীদের বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। যদিও এই দাবির পক্ষে তিনি কোনও নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দেননি। অন্যদিকে, আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
চুক্তি হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এই পথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার, পরিবহণ খরচ এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে।
তবে এখনই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে, এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ইউরেনিয়াম সরানো, পরমাণু কর্মসূচির উপর নজরদারি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা—প্রতিটি বিষয়েই দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত কমানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু খসড়া থেকে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছনোই এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।