রাশিয়ার লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মোকাবিলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবে অনুমোদন দিল আমেরিকা। এই অস্ত্র কিনতে খরচ হবে প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলার। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির আশঙ্কা, নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পেতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। তাই আপাতত মিত্র দেশগুলির মজুত থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
৫০০ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রিতে মার্কিন অনুমোদন
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে কিয়েভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তার সিদ্ধান্ত নিল ওয়াশিংটন। শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ইউক্রেনের কাছে ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন বিদেশ দফতর। এই চুক্তির আনুমানিক মূল্য ২.১ বিলিয়ন ডলার। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রগুলি রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আকাশপথের হামলা প্রতিহত করতে ইউক্রেনকে সাহায্য করবে।

এই বিক্রির ক্ষেত্রে প্রধান ঠিকাদার হিসেবে থাকছে মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থা লকহিড মার্টিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি আমেরিকার তরফে ইউক্রেনকে বিনামূল্যে অস্ত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। বরং মিত্র দেশগুলির আর্থিক সহায়তা এবং ইউক্রেনের জন্য নির্দিষ্ট অর্থায়নের মাধ্যমে এই ক্ষেপণাস্ত্র কেনা হবে।
কারা দেবে ২.১ বিলিয়ন ডলার?
মার্কিন বিদেশ দফতরের বিবৃতি অনুযায়ী, এই অস্ত্র কেনার অর্থের জোগান দেবে কানাডা, জার্মানি ও নরওয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের JUMPSTART কর্মসূচির মাধ্যমে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউক্রেন সাপোর্ট লোন থেকে অর্থায়িত জাতীয় তহবিলও কাজে লাগানো হবে।
অর্থাৎ, ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিলেও এই চুক্তিতে সরাসরি মার্কিন সরকারি অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে না। ওয়াশিংটনের দাবি, এই বিক্রির ফলে ইউক্রেনের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে। একইসঙ্গে ইউরোপের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও তা সহায়ক হতে পারে।
ক্ষেপণাস্ত্র পেতে কয়েক বছর অপেক্ষা?
এই ঘোষণার পরেও ইউক্রেনের সামনে বড় সমস্যা রয়েছে। কারণ অনুমোদন মিললেই সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পাওয়া যাবে না। নতুন করে তৈরি করতে হবে এই ইন্টারসেপ্টরগুলি। ফলে সরবরাহের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শুক্রবার মার্কিন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ শুরু হতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। তাঁর বক্তব্য, ইউক্রেনের প্রয়োজন এখনই, কয়েক বছর পরে নয়।
জেলেনস্কি তাই আমেরিকা এবং ইউরোপের মিত্র দেশগুলির কাছে একটি বিকল্প প্রস্তাব রেখেছেন। তাঁর আবেদন, মিত্র দেশগুলির হাতে বর্তমানে যে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে, তার একটি অংশ আপাতত ইউক্রেনকে দেওয়া হোক। পরে নতুন করে কেনা ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সেই দেশগুলির অস্ত্রভাণ্ডার পূরণ করা যেতে পারে।
কেন ইউক্রেনের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রিয়ট?
প্যাট্রিয়ট একটি উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের বিমান, ড্রোন এবং নির্দিষ্ট ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশেই ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়। রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের শহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি পরিকাঠামো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিয়েভের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে প্যাট্রিয়টের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার হামলার তীব্রতা বাড়ায় তাদের হাতে থাকা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে। চলতি মাসেই জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, দেশের হাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
আমেরিকা-ইউক্রেন সম্পর্কে টানাপড়েন
এই অনুমোদন এমন এক সময়ে এল, যখন ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে কিছুটা টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। ইউক্রেনের অভিযোগ ছিল, অন্যান্য দেশ তাদের জন্য যে ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে, সেগুলির সরবরাহের অনুমোদন দিতেও পেন্টাগন দেরি করছে। জেলেনস্কি এর আগে জানিয়েছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেপ্টর পাওয়ার অনুমতির জন্য তাঁদের প্রায় এক মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে।

এছাড়াও গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান এবং স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ইউক্রেনের বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়ার হামলার আগাম সতর্কবার্তা পেতে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরে কিয়েভ জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান এবং স্টারলিঙ্ক পরিষেবার গতি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হয়েছে।
অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা আমেরিকার
বিশ্বজুড়ে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সহজ নয়। ইউক্রেন ছাড়াও একাধিক দেশ নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এই ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে আগ্রহী। পাশাপাশি আমেরিকার নিজস্ব সামরিক প্রয়োজন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংঘাতেও উন্নত প্রতিরক্ষা অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে মার্কিন সেনাবাহিনী লকহিড মার্টিনকে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর উৎপাদনের জন্য সর্বোচ্চ ৫৮.৬ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি দিয়েছিল। সংস্থাটি ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ PAC-3 MSE ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা তিন গুণ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও ইউক্রেনের বর্তমান ঘাটতি কত দ্রুত মেটানো যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে, ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলি কবে হাতে পৌঁছচ্ছে, তার উপর। তাই নতুন সরবরাহের অপেক্ষার পাশাপাশি মিত্র দেশগুলির বর্তমান মজুত থেকে দ্রুত অস্ত্র পাওয়াই এখন কিয়েভের কাছে বড় অগ্রাধিকার।