শুভেন্দু অধিকারীর প্রাক্তন আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ফের বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক হতাশা থেকেই চন্দ্রনাথকে খুন করিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তদন্তের অগ্রগতি উল্লেখ করে অভিষেকের উদ্দেশে কড়া বার্তাও দিয়েছেন তিনি। তবে এই অভিযোগের পক্ষে এখনও কোনও আদালত-স্বীকৃত প্রমাণ সামনে আসেনি।
চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। এবার সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম করে গুরুতর অভিযোগ তুললেন রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং। তাঁর দাবি, বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এবং সরকার গঠনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা থেকেই চন্দ্রনাথ রথকে খুন করানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এই মামলায় তদন্তের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে অভিষেকের কাছে শীঘ্রই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা পৌঁছে যাবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
“হতাশায় চন্দ্রনাথকে খুন করিয়েছিল অভিষেক”
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অর্জুন সিং বলেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভেবেছিলেন তাঁদের সরকার ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল সেই প্রত্যাশা পূরণ না করায় হতাশা থেকে চন্দ্রনাথ রথকে খুন করানো হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
অর্জুনের বক্তব্য, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হতাশায় চন্দ্রনাথ রথকে খুন করিয়েছে। ও ভেবেছিল ওদের সরকার হবে। যা তদন্ত চলছে, খুব শীঘ্রই ওঁর কাছে পৌঁছে যাবে সিবিআই”। তাঁর দাবি, “তদন্ত যে দিকে এগোচ্ছে, তাতে অভিষেকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে”।
১৮০ জনের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ নিয়েও অভিযোগ
শুধু চন্দ্রনাথ রথের খুন নয়, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর গতিবিধির উপর নজরদারি চালানোর অভিযোগও তুলেছেন অর্জুন। তাঁর দাবি, প্রায় ১৮০ জনকে নিয়ে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে। সেই গ্রুপের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী কোথায় যাচ্ছেন, কখন কোথা থেকে বেরোচ্ছেন, কোথায় অবস্থান করছেন—সেই সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর।
অর্জুনের দাবি, এই নজরদারির পিছনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ রয়েছে। এমনকী মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য বিষয়টিকে বিপজ্জনক বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে অভিষেককে অবিলম্বে গ্রেফতার করার দাবিও তুলেছেন পরিবহণমন্ত্রী। তবে এখনও পর্যন্ত ১৮০ জনের ওই হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp) গ্রুপের কোনরকম হদিশ পাওয়া যায়নি বলে খবর সুত্রের।

কেন ফের অভিষেককে নিশানা অর্জুনের?
অর্জুনের এই মন্তব্যের ঠিক আগের দিনই পুলিশি ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে অন্যায় বা হয়রানি হলে সংশ্লিষ্টদের নাম নথিভুক্ত করে রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে কাউকে রেয়াত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি।
অভিষেকের সেই মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিতেই অর্জুন সিং তাঁকে হতাশাগ্রস্ত বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর দাবি, তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অভিষেক উদ্বিগ্ন বলেই এমন বক্তব্য রাখছেন। ফলে চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের পাশাপাশি দুই রাজনৈতিক শিবিরের বাকযুদ্ধও নতুন করে তীব্র হয়েছে।
গত ৬ মে রাতে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়া এলাকায় গুলিতে খুন হন চন্দ্রনাথ রথ। তিনি বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও প্রাক্তন আপ্তসহায়ক ছিলেন। গাড়িতে করে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর গাড়ির পথ আটকে হামলা চালায় দুষ্কৃতীরা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর থেকেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছিল। প্রথমে রাজ্য পুলিশের তদন্তের পর মামলাটি সিবিআইয়ের হাতে যায়। তদন্তে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এই মামলায় তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের ৭ অগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, সিবিআই চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক চার্জশিটে ১১ জনের নাম উল্লেখ করেছে। তাঁদের মধ্যে দু’জন বিজেপি কর্মীও রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অর্থের জোগান এবং শ্যুটার নিয়োগের সঙ্গে কয়েকজন যুক্ত ছিলেন।
রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই নজর তদন্তে
চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই রাজনৈতিক তরজা বাড়ছে। একদিকে শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপি নেতৃত্বের তরফে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, অন্যদিকে তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আক্রমণ—সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত।
অর্জুন সিংয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে তাঁর অভিযোগের সত্যতা তদন্তে কতটা উঠে আসে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারী কারা, কারা অর্থ জুগিয়েছিল এবং কারা হামলার পরিকল্পনা করেছিল—সেই প্রশ্নগুলির চূড়ান্ত উত্তর মিলবে তদন্ত ও আদালতের বিচারপ্রক্রিয়াতেই।