আমেরিকার অ্যাটলান্টায় দু’দিনের জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষ হলেও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে সদস্য দেশগুলির মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হল না। আন্তর্জাতিক সংঘাত, কূটনৈতিক অবস্থান এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত মতপার্থক্য আলোচনায় উঠে এলেও কোনও সর্বসম্মত চুক্তিতে পৌঁছতে পারেননি প্রতিনিধিরা। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে জি-২০-র ঐক্য এবং কার্যকর ভূমিকা নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠছে।
যৌথ বিবৃতি নয়, প্রকাশিত হবে চেয়ারম্যানের বক্তব্য
বৈঠকের শেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জি-২০-র সদস্য দেশগুলির পক্ষ থেকে কোনও যৌথ বিবৃতি বা জয়েন্ট কমিউনিক প্রকাশ করা হচ্ছে না। তার পরিবর্তে বৈঠকের আলোচনার সারাংশ তুলে ধরে একটি চেয়ারম্যানের বিবৃতি প্রকাশ করবেন মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিয়ো।
কূটনীতিকদের বক্তব্য, ইউক্রেন যুদ্ধ-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দেশগুলির অবস্থান এতটাই আলাদা যে, সকলের সম্মতিতে একটি অভিন্ন বিবৃতি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। বৈঠকের শুরুতে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন রুবিয়ো। কিন্তু আলোচনার পরেও সেই ঐকমত্য অধরাই থেকে যায়।

লাভরভকে ঘিরে বিতর্ক, বাতিল পারিবারিক ছবি
বৈঠকের শুরুতেই কূটনৈতিক অস্বস্তি প্রকাশ্যে চলে আসে রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের উপস্থিতি ঘিরে। ইউরোপের কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা রুশ বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে একই ফ্রেমে ছবি তুলতে আপত্তি জানান। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, লাভরভের সঙ্গে যৌথ ছবি তোলা হলে তা ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভুল বার্তা দিতে পারে।
পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, সম্ভাব্য বয়কট বা ছবি তোলার সময় সরে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন কয়েক জন ইউরোপীয় কূটনীতিক। শেষ পর্যন্ত শুক্রবারের প্রচলিত গ্রুপ ফটো বাতিল করেন রুবিয়ো। সাধারণত এ ধরনের আন্তর্জাতিক বৈঠকের শুরুতে সদস্য দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীরা একসঙ্গে ছবি তোলেন। কিন্তু অ্যাটলান্টার বৈঠকে সেই প্রথাও বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া ও ইউরোপের অবস্থান
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার অবস্থান এবং ইউরোপীয় দেশগুলির আপত্তিই বৈঠকের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বৈঠকে বলেন, ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য—বিভিন্ন সংঘাত খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলছে। তাঁর বক্তব্য, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং আন্তর্জাতিক আইনই স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার ভিত্তি হওয়া উচিত।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনে আগ্রাসনের অভিযোগ তুলে কিয়েভের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রী লাভরভ মস্কোর নিরাপত্তা সংক্রান্ত অবস্থান তুলে ধরেছেন। ফলে যুদ্ধের দায়, নিরাপত্তার শর্ত এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য থেকেই গিয়েছে।
পোল্যান্ডের বিদেশমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কিও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। জি-২০ বৈঠকে প্রথমবারের মতো অতিথি প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি বলেন, যখন আলোচনার টেবিলে এমন দেশ রয়েছে যারা নিজেরাই সংঘাতে জড়িত, তখন অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা কঠিন। তাঁর এই মন্তব্য বৈঠকের সামগ্রিক পরিস্থিতিরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।

শুধু ইউক্রেন নয়, একাধিক ইস্যুতে বিভক্ত জি-২০
আলোচনায় মতবিরোধের তালিকা শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত, মার্কিন শুল্কনীতি, দক্ষিণ চিন সাগরে চিনের কার্যকলাপ এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তাও আলোচনায় উঠে আসে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী, লোহিত সাগর, কৃষ্ণসাগর এবং দক্ষিণ চিন সাগরে অবাধ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এই জলপথগুলির উপর আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের বড় অংশ নির্ভরশীল। সংঘাত বা নিরাপত্তা সঙ্কটের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে জ্বালানির দাম এবং পণ্য পরিবহণের খরচ বেড়ে যেতে পারে।
আমেরিকা এবারের জি-২০ সভাপতিত্বে বাণিজ্যিক ভারসাম্য, মুক্ত বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থার উপর জোর দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে সেই অর্থনৈতিক আলোচনাও নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক মতবিরোধের বাইরে থাকতে পারেনি।
দক্ষিণ আফ্রিকাকে আমন্ত্রণ না জানানো নিয়েও প্রশ্ন
বৈঠকের আর একটি বিতর্কিত বিষয় ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার অনুপস্থিতি। এবারের বৈঠকে জি-২০-র সদস্য দেশ দক্ষিণ আফ্রিকাকে আমন্ত্রণ জানায়নি ট্রাম্প প্রশাসন। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্য কয়েকটি দেশের আপত্তি রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাজা কালাসও দক্ষিণ আফ্রিকার অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া পোল্যান্ডের জি-২০-তে সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়েও রাশিয়ার আপত্তির কথা সামনে এসেছে। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি জি-২০-র সদস্যপদ, প্রতিনিধিত্ব এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশগুলির অংশগ্রহণ নিয়েও মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
ডিসেম্বরের শীর্ষ সম্মেলনের দিকে নজর
অ্যাটলান্টার বৈঠকে ঐকমত্য না হলেও অংশগ্রহণকারী দেশগুলি ডিসেম্বরের জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন সফল করার বিষয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। আগামী ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর আমেরিকার ফ্লোরিডার মায়ামিতে ট্রাম্প ন্যাশনাল ডোরালে এই শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের কথা রয়েছে। সেখানে রাষ্ট্রনেতাদের উপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
অ্যাটলান্টার বৈঠক দেখিয়ে দিল, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মঞ্চ হিসেবে জি-২০-র গুরুত্ব থাকলেও যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রশ্নে সদস্য দেশগুলির মধ্যে দূরত্ব এখনও যথেষ্ট। ডিসেম্বরের বৈঠকে সেই ব্যবধান কতটা কমানো যায়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।