উৎসবের মরশুমে ঋণগ্রহীতাদের জন্য স্বস্তির খবর নেই। মূল্যবৃদ্ধি ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার মধ্যে রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। ফলে গৃহঋণ, গাড়ির ঋণ ও ব্যক্তিগত ঋণের সুদে প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রত্যেক গ্রাহকের EMI সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে কি না, তা নির্ভর করবে ঋণের ধরন, সুদের হার এবং ব্যাঙ্কের সিদ্ধান্তের উপর।
রেপো রেট বাড়াল আরবিআই
গত ৫ থেকে ৭ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মুদ্রানীতি কমিটির (MPC) বৈঠক হয়। ৭ অক্টোবর বৈঠকের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন আরবিআই গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে এই হার ছিল ৫.২৫ শতাংশ।
শুধু রেপো রেটই নয়, স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফেসিলিটি বা SDF-এর হার ৫.২৫ শতাংশ এবং মার্জিনাল স্ট্যান্ডিং ফেসিলিটি বা MSF ও ব্যাঙ্ক রেট ৫.৭৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি মুদ্রানীতির অবস্থান ‘নিউট্রাল’ থেকে বদলে ‘ক্যালিব্রেটেড টাইটেনিং’ করা হয়েছে। অর্থাৎ, আপাতত সুদের হার কমানোর বদলে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।
কেন সুদের হার বাড়াল কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক?
আরবিআইয়ের মতে, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের নতুন করে তীব্রতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা অর্থনীতির সামনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধিতে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে MPC।
আরবিআই ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭.১ শতাংশ করেছে। একইসঙ্গে খুচরো মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৫.২ শতাংশে উন্নীত করেছে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি বজায় থাকলেও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।
গৃহঋণ ও গাড়ির ঋণের EMI কি বাড়বে?
রেপো রেট বাড়লে ব্যাঙ্কগুলির জন্য আরবিআই থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে। এর প্রভাব ব্যাঙ্কের ঋণ দেওয়ার সুদের হারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে রেপো-সংযুক্ত ফ্লোটিং রেট ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার বাড়লে EMI বাড়তে পারে অথবা ঋণ শোধের মেয়াদ বেড়ে যেতে পারে।
তবে সব ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে একই দিনে EMI বাড়বে না। যাঁদের ঋণ ফিক্সড রেটে নেওয়া, তাঁদের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সুদের হার সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে। অন্যদিকে, ফ্লোটিং রেট ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কের রিসেটের সময় এবং ঋণের বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী নতুন সুদের হার কার্যকর হয়।
উদাহরণ হিসেবে, ৩০ লক্ষ টাকার গৃহঋণ যদি ২৫ বছরের জন্য নেওয়া হয় এবং সুদের হার ৭.৫০ শতাংশ থেকে ৭.৭৫ শতাংশে ওঠে, তাহলে মাসিক EMI প্রায় ৪৯০ টাকা বাড়তে পারে। ৪০ লক্ষ টাকার ঋণে বৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ৬৫৪ টাকা এবং ৫০ লক্ষ টাকার ঋণে প্রায় ৮১৭ টাকা। এগুলি আনুমানিক হিসাব; প্রকৃত EMI ব্যাঙ্কের সুদের হার, ঋণের বাকি মেয়াদ এবং রিসেটের নিয়মের উপর নির্ভর করবে।
শুধু EMI নয়, ঋণের মেয়াদও বাড়তে পারে
সুদের হার বাড়লে ব্যাঙ্কের সামনে সাধারণত দুটি পথ থাকে। প্রথমত, গ্রাহকের মাসিক কিস্তি বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, EMI একই রেখে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক দ্বিতীয় পদ্ধতি বেছে নেয়, যাতে গ্রাহকের মাসিক খরচ হঠাৎ বেড়ে না যায়।
কিন্তু মেয়াদ বাড়লে দীর্ঘ সময়ে মোট সুদের পরিমাণও বেড়ে যেতে পারে। তাই ঋণগ্রহীতাদের ব্যাঙ্কের কাছ থেকে নতুন সুদের হার, সংশোধিত EMI এবং ঋণের অবশিষ্ট মেয়াদ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া জরুরি।
সঞ্চয়কারীদের জন্য কি বাড়বে লাভ?
রেপো রেট বাড়লে ঋণের সুদের পাশাপাশি ব্যাঙ্কের আমানতের সুদেও পরিবর্তন আসতে পারে। ব্যাঙ্কগুলি নতুন ফিক্সড ডিপোজিট বা মেয়াদি আমানতের সুদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে তা বাধ্যতামূলক নয়। প্রতিটি ব্যাঙ্ক নিজেদের তহবিলের প্রয়োজন, আমানতের পরিমাণ এবং বাজারের পরিস্থিতি বিচার করে সুদের হার নির্ধারণ করে।
তাই যাঁরা নতুন করে ফিক্সড ডিপোজিট করতে চাইছেন, তাঁদের বিভিন্ন ব্যাঙ্কের সুদের হার তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। পুরনো আমানতের ক্ষেত্রে সুদের হার সাধারণত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কার্যকর থাকে।
ঋণগ্রহীতাদের এখন কী করা উচিত?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ঋণগ্রহীতাদের প্রথমেই নিজেদের ঋণ ফিক্সড না ফ্লোটিং রেটে নেওয়া, তা যাচাই করা উচিত। ফ্লোটিং রেট হলে ব্যাঙ্কের কাছে জানতে হবে নতুন সুদের হার কবে থেকে কার্যকর হবে। EMI বাড়বে, নাকি ঋণের মেয়াদ বাড়বে, সেটিও পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন।
যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তাঁরা অতিরিক্ত কিছু টাকা মূল ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করতে পারেন। এতে ঋণের বাকি অঙ্ক এবং ভবিষ্যতের সুদের বোঝা কমতে পারে। তবে আগাম ঋণ পরিশোধের কোনও চার্জ রয়েছে কি না, তা আগে জেনে নেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে, আরবিআইয়ের রেপো রেট বৃদ্ধির ফলে ঋণগ্রহীতাদের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যেকের EMI বাড়বে, এমন নয়। ব্যাঙ্কের সুদের হার সংশোধন এবং ঋণের শর্তই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কার কতটা অতিরিক্ত খরচ হবে।