ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত—বিশ্বজুড়ে একের পর এক সঙ্কটের আবহে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের বদলে কূটনৈতিক আলোচনার উপর জোর দিল ভারত। আমেরিকার অ্যাটলান্টায় জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে সব পক্ষকে আলোচনার পথে এগোনোর আহ্বান জানিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বার্তা
শুক্রবার জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন জয়শঙ্কর। তাঁর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা, পাল্টা হামলা এবং বাণিজ্যপথে বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জয়শঙ্কর নিজের বক্তব্যের মূল বিষয়গুলি সমাজমাধ্যমে তুলে ধরে জানান, বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া সঙ্কটের মুখে সামরিক সমাধান কার্যকর হবে না। কূটনীতিকে সুযোগ দিতে হবে। তাঁর এই বার্তা কোনও একটি নির্দিষ্ট সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক সঙ্কট মোকাবিলায় আলোচনার গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছে।
বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা নিয়ে উদ্বেগ
জয়শঙ্করের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা। তাঁর মতে, বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের উপর হামলা বন্ধ করা জরুরি। আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে রাষ্ট্রপুঞ্জের সমুদ্র আইন সংক্রান্ত কনভেনশন বা UNCLOS মেনে চলার উপর জোর দিয়েছেন তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলির উপর পড়ে না। জ্বালানি, খাদ্য এবং সার সরবরাহের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হলে সরবরাহ কমে যেতে পারে, পরিবহণ খরচ বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের উপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ পড়তে পারে।
জয়শঙ্করের বক্তব্য, এই পরিস্থিতিতে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলি তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে। কারণ অনেক দেশই জ্বালানি, খাদ্য এবং সারের আমদানির উপর নির্ভরশীল।

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যু
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব যে ভারতের উপরেও পড়েছে, তা উল্লেখ করেছেন বিদেশমন্ত্রী। সরকারি সংবাদমাধ্যম আকাশবাণীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিম এশিয়ায় অন্তত ২২ জন ভারতীয়ের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৪ জনই নাবিক।
এই পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করেছে। ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণ এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা—এই তিনটি বিষয়ই নয়াদিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সমুদ্রপথে হামলা বা অবরোধের ফলে শুধু জাহাজের কর্মীদের জীবন বিপন্ন হয় না, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ে। তাই জয়শঙ্কর স্বাধীন নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা নিয়েও সরব ভারত
জি-২০ বৈঠকে জ্বালানি বাণিজ্য ও পরিকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জয়শঙ্কর। তাঁর বক্তব্য, জ্বালানি সরবরাহের পরিকাঠামো এবং বাণিজ্যের উপর পরিকল্পিত হামলা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের উপর চাপ তৈরি করার কৌশল হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, বর্তমান জ্বালানি সঙ্কট কেবল উৎপাদনের ঘাটতির কারণে তৈরি হচ্ছে না। সরবরাহের অনিশ্চয়তা, পরিবহণে বিঘ্ন, অতিরিক্ত খরচ এবং জ্বালানি পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যাও সঙ্কটকে গভীর করছে।

ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে নির্ভরযোগ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য এলপিজি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির উপর নির্ভরশীল সাধারণ পরিবারগুলির কথা মাথায় রেখে জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন বিদেশমন্ত্রী।
গ্লোবাল সাউথের অর্থনৈতিক স্বার্থের কথাও তুলে ধরলেন
জয়শঙ্কর শুধু যুদ্ধ বা নিরাপত্তার বিষয়েই বক্তব্য রাখেননি। উন্নয়নশীল দেশগুলির শিল্পায়নের অধিকার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সমান সুযোগের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, বাজারে অতিরিক্ত পণ্য ঢেলে দেওয়া, সরবরাহ শৃঙ্খলকে রাজনৈতিক বা কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, বাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করা এবং বাণিজ্যে কৃত্রিম বাধা তৈরি করার প্রবণতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, ভবিষ্যতের সঙ্কট মোকাবিলায় বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আরও শক্তিশালী সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার উপর জোর দিয়েছেন তিনি।
সন্ত্রাসবাদ নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, সাময়িক কৌশলগত লাভের হিসাব করতে গিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিপদকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।
https://x.com/ians_india/status/2116369579769541116?s=20
আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের অবস্থান
অ্যাটলান্টার বৈঠকে জয়শঙ্করের বক্তব্যে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে—সংঘাতের বদলে আলোচনা, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের স্বাধীনতা, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা।
তবে জি-২০ বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ইস্যুতে সদস্য দেশগুলির মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়নি। ফলে ভারতের এই আহ্বান গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনও যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব হয়নি।
এখন নজর ডিসেম্বরের জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের দিকে। তার আগে বিভিন্ন দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা কতটা এগোয়, এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত কমাতে কোনও অভিন্ন অবস্থান তৈরি হয় কি না, সেটাই দেখার।