ভুটানের শিনতাফু হ্রদ ভেঙে বিপুল জলরাশি নেমে আসায় উত্তরবঙ্গ ও অসমের একাধিক এলাকায় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সঙ্কোশ নদীর জলস্তর বাড়তে থাকায় আলিপুরদুয়ারে প্রায় ১২ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে প্রশাসন। তবে সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, নদীর জলস্তর কিছুটা কমেছে। পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও জেলা প্রশাসন।
ভুটানে হ্রদ ভেঙে নেমে এল বিপুল জলরাশি
ভুটানের পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহের গলা জল জমে তৈরি হয়েছিল শিনতাফু হ্রদ। বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় সেই হ্রদের বাঁধ ভেঙে বিপুল জলরাশি নেমে আসে। ভুটানের গাসা অঞ্চলের এই ঘটনায় পাহাড়ি নদীগুলিতে আচমকা জল ও স্রোতের চাপ বেড়ে যায়। তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী নদী অববাহিকাতেও।
প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, হ্রদ থেকে প্রায় ৭৪ লক্ষ ঘনমিটার জল বেরিয়ে আসে। সেই জল প্রথমে মো নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সঙ্কোশ নদীর দিকে এগোয়। সঙ্কোশ নদী পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার এবং অসমের ধুবড়ি এলাকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নদী। ফলে জলস্তর দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দুই রাজ্যের প্রশাসনকেই সতর্ক করা হয়।

আলিপুরদুয়ারে ১২ হাজার বাসিন্দাকে সরানো হল
ভুটান থেকে নেমে আসা জল সঙ্কোশ নদীতে পৌঁছতে পারে—এই আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার রাত থেকেই আলিপুরদুয়ারের নদী তীরবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি করে প্রশাসন। বিশেষ করে কুমারগ্রাম এলাকার নিচু ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলির বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, শুক্রবার প্রায় ১২ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকে স্থানীয় স্কুল ও ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে পানীয় জল, শুকনো খাবার, শিশুদের খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেক বাসিন্দা গবাদি পশু নিয়েও বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যান।
আলিপুরদুয়ারের পুলিশ সুপার অমিত কুমার শা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রশাসন ও পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার এবং ত্রাণের কাজ চালাচ্ছে।
বাড়ছিল সঙ্কোশের জলস্তর, এখন কিছুটা স্বস্তি
প্রাথমিকভাবে সঙ্কোশ নদীর জলস্তর বাড়তে শুরু করায় উদ্বেগ ছড়িয়েছিল। শুক্রবার সকাল নাগাদ নদীর জল প্রায় দু’ফুট বেড়েছিল বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর। ভুটানের পাহাড়ি এলাকা থেকে আরও জল নেমে এলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে, এমন আশঙ্কাও ছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে নদীর জলস্তর কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন আধিকারিকেরা। ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভুটান থেকে নেমে আসা জল সঙ্কোশ নদী দিয়ে প্রবাহিত হলেও আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারের বিস্তীর্ণ এলাকায় বড় ধরনের প্লাবন হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতে যাঁরা ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁদের একাংশ শুক্রবার সকালে বাড়ি ফিরতেও শুরু করেন।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে, এমনটা বলছে না প্রশাসন। পাহাড়ে নতুন করে বৃষ্টি হলে নদীর জল আবার বাড়তে পারে। তাই নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

NDRF, SDRF-সহ বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী প্রস্তুত
সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা NDRF এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা SDRF-কে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মীরাও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করছেন। নদীর জলস্তর ও স্রোতের গতিবিধির উপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে।
ভুটানের প্রশাসনের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। নদীর উজানে জলপ্রবাহের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে জলস্তর আচমকা বাড়লে দ্রুত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করা যায়। কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের সতর্কবার্তাতেও আলিপুরদুয়ার ও অসমের ধুবড়ি এলাকায় সঙ্কোশ নদীর জলস্তর দ্রুত বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল।
ভুটানেও ক্ষয়ক্ষতির খবর, নজরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প
এই বিপর্যয়ের প্রভাব শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। ভুটানের গাসা অঞ্চলের জনপ্রিয় প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণ কেন্দ্র গাসা ছাচুর পরিকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। লায়া গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে আগাম সতর্কতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার কারণে এখনও পর্যন্ত প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
আপাতত স্বস্তি, তবু সতর্ক উত্তরবঙ্গ
ভুটানের হ্রদ বিপর্যয়ের জেরে উত্তরবঙ্গের নদীগুলির জলস্তর নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, আপাতত পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। কিন্তু পাহাড়ি নদীর ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যে জলস্তর বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে উজানে বৃষ্টি বা নতুন করে জলপ্রবাহ বাড়লে ভাটির এলাকায় বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়।
তাই সঙ্কোশ নদীর আশপাশের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের নজর এখন ভুটানের জলপ্রবাহ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং নদীর বর্তমান পরিস্থিতির দিকে। আগামী কয়েক ঘণ্টায় পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার উপরই নির্ভর করবে সরিয়ে নেওয়া বাসিন্দাদের প্রত্যাবর্তন এবং সতর্কতার পরবর্তী সিদ্ধান্ত।