প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধী জোট INDIA-র পরিকল্পিত প্রতীকী ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। শুক্রবার দিল্লিতে বৃষ্টির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। কর্মসূচিটি শনিবার, ৩১ অক্টোবর একই সময়ে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে আয়োজন করা হবে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR এবং কথিত ‘ভোট চুরি’ নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনের অংশ হিসেবেই এই কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বৃষ্টিতে ভেস্তে গেল শুক্রবারের কর্মসূচি
শুক্রবার দিল্লিতে সকাল থেকেই বৃষ্টি হওয়ায় রাজধানীর আবহাওয়া প্রতিকূল হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে প্রবীণ রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে খোলা জায়গায় দীর্ঘক্ষণ কর্মসূচি চালানো অসুবিধাজনক হতে পারে বলে মনে করেন বিরোধী নেতারা। শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মতিক্রমে কর্মসূচি একদিন পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের ১০, রাজাজি মার্গের বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রাহুল গান্ধী জানান, বৃষ্টির কারণে শুক্রবারের অনুষ্ঠান শনিবার একই সময়ে আয়োজন করা হবে। তাঁর বক্তব্য, প্রবীণ নেতাদের বৃষ্টির মধ্যে বসে থাকতে অসুবিধা হতে পারে। তাই কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
![]()
খাড়গের বাসভবনেই হবে প্রতীকী ‘জন-অভিশংসন’
প্রথমে বিরোধী জোটের এই কর্মসূচি অন্য কয়েকটি জায়গায় আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু সংবিধান ক্লাব এবং তালকাটোরা স্টেডিয়ামের মতো জায়গায় অনুমতি না মেলায় শেষ পর্যন্ত খাড়গের বাসভবনকেই অনুষ্ঠানের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
বিরোধীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কর্মসূচি হবে প্রায় তিন ঘণ্টার একটি প্রতীকী শুনানি বা ‘মক ইমপিচমেন্ট’। প্রাক্তন লোকসভার স্পিকার মীরা কুমার এই প্রক্রিয়ায় সভাপতিত্ব করবেন বলে জানা গিয়েছে। খাড়গে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উত্থাপন করবেন এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী শেষ বক্তব্য রাখবেন। অন্তত ২১টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের সদস্যদেরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
কেন নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিরোধীদের?
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা Special Intensive Revision (SIR) প্রক্রিয়া পরিচালনায় নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে না। বিরোধীদের দাবি, এই প্রক্রিয়ার ফলে বহু যোগ্য ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই তাঁরা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন।
তবে বিরোধীদের এই অভিযোগকে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান থেকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত বা একাধিকবার নথিভুক্ত ভোটারদের শনাক্ত করে তালিকা সংশোধন করাই SIR-এর উদ্দেশ্য। যাঁদের নাম বাদ পড়েছে বলে মনে হচ্ছে, তাঁদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াও রয়েছে। ফলে এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, যোগ্য ভোটারের অধিকার এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা।
সংসদে অপসারণের নোটিসও দিয়েছিল বিরোধীরা
জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে বিরোধীরা এর আগেও সংসদের দুই কক্ষে নোটিস জমা দিয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ১২ মার্চ লোকসভায় ১৩০ জন এবং রাজ্যসভায় ৬৩ জন সাংসদের স্বাক্ষর-সহ নোটিস জমা পড়ে। তবে ৬ এপ্রিল লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সেই নোটিসগুলি গ্রহণ করেননি।
এরপরই বিরোধীরা সংসদের বাইরে জনসমক্ষে প্রতীকী ‘ইমপিচমেন্ট’ কর্মসূচির পরিকল্পনা করে। উল্লেখ্য, শনিবারের এই আয়োজন কোনও আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক অভিশংসন প্রক্রিয়া নয়। এটি বিরোধী জোটের রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং নিজেদের অভিযোগ জনসমক্ষে তুলে ধরার একটি প্রতীকী কর্মসূচি।

১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে বড় সমাবেশ
শুধু প্রতীকী জন-অভিশংসন নয়, আগামী ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানেও বড় সমাবেশের পরিকল্পনা করেছে INDIA জোট। ভোটার তালিকার SIR প্রক্রিয়া এবং কথিত ভোট কারচুপির অভিযোগকে সামনে রেখেই এই সমাবেশের আয়োজন করা হচ্ছে। বিরোধী নেতাদের বক্তব্য, ভোটাধিকার রক্ষা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার দাবিতে তাঁরা একজোট হয়েছেন।
রাহুল গান্ধী জানিয়েছেন, এই কর্মসূচিতে রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষকেও অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ফলে শনিবারের প্রতীকী কর্মসূচির পর রবিবারের সমাবেশ বিরোধীদের আন্দোলনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হয়ে উঠতে পারে।
শনিবারের কর্মসূচির দিকে নজর রাজনৈতিক মহলের
সব মিলিয়ে দিল্লিতে বৃষ্টির কারণে একদিন পিছিয়ে গেলেও জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের পরিকল্পিত কর্মসূচি বাতিল হচ্ছে না। শনিবার খাড়গের বাসভবনে প্রতীকী জন-অভিশংসনের পর রবিবার রামলীলা ময়দানে সমাবেশের মাধ্যমে আন্দোলন আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে INDIA জোটের।
এই কর্মসূচিতে বিরোধী দলগুলি কী কী অভিযোগ সামনে আনে এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী ধরনের বক্তব্য উঠে আসে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। অন্যদিকে, SIR নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ও বিরোধীদের অভিযোগের মধ্যে বিতর্ক আগামী দিনেও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।