ভারতীয় শেয়ার বাজারে চলতি সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন শেয়ারে বিক্রির চাপের কারণে বাজারে অস্থিরতা দেখা গিয়েছে। শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, সেনসেক্স ও নিফটি ৫০ টানা চতুর্থ দিনের মতো নিম্নমুখী প্রবণতায় লেনদেন শেষ করেছে।
শনিবার ও রবিবার ভারতীয় শেয়ার বাজার সাধারণত বন্ধ থাকে। ফলে আজকের বাজার-সংক্রান্ত খবরের ক্ষেত্রে শুক্রবারের লেনদেন এবং আগামী সপ্তাহের সম্ভাব্য বাজারের গতিপ্রকৃতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সেনসেক্স ও নিফটির পতনে চাপে বিনিয়োগকারীরা:
শুক্রবার বিএসই সেনসেক্স ১২৫.৫৬ পয়েন্ট বা ০.১৭ শতাংশ কমে ৭৩,১২৩.৮৩ পয়েন্টে বন্ধ হয়েছে। অন্যদিকে, এনএসই নিফটি ৫০ প্রায় ৮৮ পয়েন্ট বা ০.৩৯ শতাংশ কমে ২২,৬০০ পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থানে লেনদেন শেষ করেছে।
দিনের লেনদেনের এক পর্যায়ে বাজার আরও নিচে নেমে গেলেও শেষের দিকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। তবে সেই পুনরুদ্ধার বাজারকে ইতিবাচক অবস্থানে ফেরাতে পারেনি।
অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ:
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি ভারতীয় শেয়ার বাজারের জন্য অন্যতম বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তেল সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কা আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ তৈরি করছে। 
ভারত অপরিশোধিত তেলের আমদানির উপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম বেশি থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর পাশাপাশি টাকার বিনিময়মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি এবং বিভিন্ন সংস্থার উৎপাদন খরচের উপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দামের গতিপ্রকৃতি আগামী সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের নজরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম হতে পারে।
মিডক্যাপ ও স্মলক্যাপ শেয়ারে বেশি বিক্রির চাপ:
শুক্রবার বড় সূচকগুলির পাশাপাশি মিডক্যাপ ও স্মলক্যাপ শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য বিক্রির চাপ দেখা যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিফটি মিডক্যাপ ১০০ সূচক ২.২১ শতাংশ এবং নিফটি স্মলক্যাপ ১০০ সূচক ২.৯৪ শতাংশ কমেছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যে মেটাল, রিয়েলটি এবং কনজিউমার ডিউরেবলস সংস্থার শেয়ারে দুর্বলতা দেখা গিয়েছে। নিফটি মেটাল সূচক ২.৭১ শতাংশ এবং নিফটি রিয়েলটি সূচক ২.৩৮ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, নিফটি পিএসইউ ব্যাংক সূচকও ২.২৬ শতাংশ পতনের সঙ্গে লেনদেন শেষ করেছে।
বাজারের এই প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে চাপ কেবল বড় সংস্থার শেয়ারে সীমাবদ্ধ নেই; ছোট ও মাঝারি সংস্থার শেয়ারেও বিনিয়োগকারীদের সতর্কতা বেড়েছে।
নজরে একাধিক বড় সংস্থার শেয়ার:
শুক্রবার কয়েকটি বড় সংস্থার শেয়ারে কেনাকাটা দেখা গেলেও অন্য একাধিক শেয়ার নিম্নমুখী ছিল।
এটারনালের শেয়ার প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এবং টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেসের শেয়ারও ইতিবাচক অবস্থানে লেনদেন শেষ করেছে।
অন্যদিকে, টাটা স্টিলের শেয়ার ৩.২১ শতাংশ, আদানি পোর্টসের শেয়ার ৩.০৩ শতাংশ এবং ট্রেন্টের শেয়ার ২.১৩ শতাংশ কমেছে।
আগামী সপ্তাহে বিভিন্ন সংস্থার ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফল, ব্যবসায়িক অগ্রগতি এবং পরিচালন কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের উপর বিনিয়োগকারীদের নজর থাকতে পারে।
জিও প্ল্যাটফর্মসের আইপিও ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন:
জিও প্ল্যাটফর্মসের সম্ভাব্য আইপিও-সংক্রান্ত অগ্রগতি বাজারের আলোচনায় রয়েছে। এই ধরনের বড় আইপিও ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এবং বাজারের তারল্যের উপর সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে আইপিও-সংক্রান্ত চূড়ান্ত তথ্য ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রকাশিত বিবৃতি যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে, বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের লেনদেনও বাজারের গতিপ্রকৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপ বাড়লে বাজার দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে, দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কেনাকাটা বাজারকে কিছুটা সমর্থন জোগাতে পারে।
আগামী সোমবার শেয়ার বাজারের দিশা কী হতে পারে?
শনিবার ও রবিবার বাজার বন্ধ থাকার পর সোমবার, ২৬ অক্টোবর, নতুন সপ্তাহের লেনদেন শুরু হবে। সেই সময় বিনিয়োগকারীদের নজর থাকতে পারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর:
- আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা।
- মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি।
- ডলার-রুপির বিনিময় হার।
- বিদেশি ও দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের লেনদেন।
- বিভিন্ন সংস্থার ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফল।
- সেনসেক্স ও নিফটির গুরুত্বপূর্ণ স্তরে বাজারের প্রতিক্রিয়া।
তেলের দাম উঁচু অবস্থানে থাকলে এবং আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকতে পারে। তবে বাজারের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে নতুন তথ্য, বিনিয়োগকারীদের মনোভাব এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর।
বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ:
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং ঝুঁকি বিবেচনা করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র স্বল্পমেয়াদি বাজারের ওঠানামা দেখে শেয়ার কেনা বা বিক্রি করার পরিবর্তে সংস্থার আর্থিক অবস্থা, মূল্যায়ন এবং নিজের বিনিয়োগের লক্ষ্য বিবেচনা করা উচিত।
দাবিত্যাগ: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনও শেয়ার কেনা বা বিক্রির পরামর্শ নয়। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা করুন অথবা নিবন্ধিত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নিন।